শিশুরা মুখে বলতে পারে না কোথায় কষ্ট হচ্ছে। তাই বাবা মাকেই লক্ষণ দেখে বুঝে নিতে হয়। কোন উপসর্গে ঘরে দেখা যায়, কোনটায় সাথে সাথে হাসপাতালে নিতে হয়, আর ঘরে বসে শিশুর শ্বাস গুনে নিউমোনিয়ার আভাস কীভাবে পাবেন, সব এক জায়গায়।

শিশু অসুস্থ হলে বাবা মায়ের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তাটা হয় একটা প্রশ্ন নিয়ে। এটা কি সাধারণ জ্বর সর্দি, নাকি গুরুতর কিছু।
প্রশ্নটা কঠিন, কারণ ছোট শিশু নিজে বলতে পারে না তার কোথায় কষ্ট হচ্ছে। ফলে দুই ধরনের ভুল হয়। কেউ সামান্য সর্দিতেই আতঙ্কিত হয়ে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দেন, আবার কেউ সত্যিকারের বিপদচিহ্ন দেখেও ভাবেন "ঠান্ডা লেগেছে, সেরে যাবে"।
ভালো খবর হলো, চিকিৎসাবিজ্ঞানে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ চিহ্নিত করা আছে যেগুলো বাবা মা ঘরে বসেই দেখতে পারেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার শিশু রোগ ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকায় এগুলোকে বলা হয় "বিপদচিহ্ন" বা danger signs।
এই লেখাটা সেই লক্ষণগুলো নিয়ে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে আছে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া, আর এগুলোর প্রায় সবই প্রতিরোধযোগ্য বা চিকিৎসাযোগ্য।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইউনিসেফ জানাচ্ছে, শিশুমৃত্যু কমানোর ক্ষেত্রে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যু ৭৭ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এখনো প্রতি বছর প্রায় এক লাখ শিশু মারা যায়, যার বেশিরভাগ কারণই প্রতিরোধযোগ্য।
উদ্বেগের জায়গাটা হলো, নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ শিশুদের অর্ধেকেরও বেশি চিকিৎসার আওতায় আসে না।
মানে সমস্যাটা ওষুধ না থাকার নয়। সমস্যাটা সময়মতো লক্ষণ চেনার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় নিচের লক্ষণগুলোকে সাধারণ বিপদচিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। এর যেকোনো একটি দেখা দিলে শিশুর জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।
শিশু কিছু খেতে বা পান করতে পারছে না
যা খাচ্ছে সবই বমি করে দিচ্ছে
খিঁচুনি হয়েছে
অস্বাভাবিক ঝিমুনি, ডাকলেও ঠিকমতো সাড়া দিচ্ছে না, বা অজ্ঞান ভাব
এগুলোর সাথে যোগ করুন:
শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া
শ্বাস নেওয়ার সময় বুকের নিচের পাঁজরের অংশ ভিতরের দিকে দেবে যাওয়া
শ্বাস নেওয়ার সময় গলা থেকে কর্কশ শব্দ হওয়া
ঠোঁট বা জিহ্বা নীলচে হয়ে যাওয়া
এই অবস্থায় চেম্বারে সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা করবেন না। সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
এটা একটা সহজ কাজ, কিন্তু বাবা মায়েরা খুব কম জানেন। নিউমোনিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক লক্ষণ হলো দ্রুত শ্বাস, আর সেটা ঘরে বসেই মাপা যায়।
কীভাবে গুনবেন
শিশু শান্ত ও স্থির থাকা অবস্থায় গুনতে হবে। কাঁদলে বা দৌড়ালে হবে না। ঘুমন্ত অবস্থায় গুনলে সবচেয়ে ভালো।
শিশুর পেট বা বুকের ওঠানামা দেখে এক মিনিটে কতবার শ্বাস নিচ্ছে সেটা গুনুন। ঘড়ি বা মোবাইলের টাইমার ব্যবহার করুন।
কত হলে দ্রুত শ্বাস ধরা হয়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী বয়সভেদে হিসাবটা আলাদা।
২ মাসের কম বয়সী শিশু: মিনিটে ৬০ বার বা তার বেশি
২ মাস থেকে ১২ মাস বয়সী শিশু: মিনিটে ৫০ বার বা তার বেশি
১২ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশু: মিনিটে ৪০ বার বা তার বেশি
সংখ্যাটা এর বেশি হলে দেরি না করে ডাক্তার দেখান। এটা নিউমোনিয়ার লক্ষণ হতে পারে।
আরেকটা জিনিস দেখবেন
শ্বাস নেওয়ার সময় শিশুর বুকের নিচের অংশ ভিতরের দিকে দেবে যাচ্ছে কিনা লক্ষ করুন। একে বলে chest indrawing। এটা দেখা গেলে অবস্থা আরো গুরুতর, সাথে সাথে হাসপাতালে নিতে হবে।
জ্বর নিজে কোনো রোগ নয়, এটা শরীরের প্রতিক্রিয়া। তাই জ্বরের মাত্রা দেখে আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর সার্বিক অবস্থা দেখুন।
যেসব ক্ষেত্রে দেরি না করে ডাক্তার দেখাবেন
তিন মাসের কম বয়সী শিশুর যেকোনো জ্বর। এই বয়সে জ্বর মানেই ডাক্তার দেখানো, অপেক্ষা করার সুযোগ নেই
জ্বরের সাথে উপরে বলা যেকোনো বিপদচিহ্ন
জ্বর তিন দিনের বেশি স্থায়ী হলে
জ্বরের সাথে ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া বা তীব্র মাথাব্যথা
শরীরে র্যাশ বা দাগ দেখা দিলে
জ্বরের সাথে খিঁচুনি
জ্বরে যা করবেন না
শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় বা কাঁথা দিয়ে ঢেকে রাখবেন না। এতে তাপ বেরোতে পারে না।
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না। বেশিরভাগ জ্বর সর্দি ভাইরাসজনিত, সেখানে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না, বরং অপ্রয়োজনে ব্যবহার করলে পরে দরকারের সময় ওষুধ কাজ না করার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বড়দের ওষুধ ভেঙে শিশুকে খাওয়াবেন না। শিশুর ওষুধের মাত্রা ওজন অনুযায়ী হিসাব করতে হয়, সেটা ডাক্তারই করবেন।
ডায়রিয়ায় শিশুর মূল বিপদ পাতলা পায়খানা নয়, বিপদটা পানিশূন্যতা।
পানিশূন্যতার লক্ষণ
চোখ বসে যাওয়া
মুখ ও জিহ্বা শুকনো
কান্নার সময় চোখে পানি না আসা
প্রস্রাব অনেক কমে যাওয়া
অস্বাভাবিক নিস্তেজ ভাব বা অতিরিক্ত খিটখিটে হওয়া
চামড়া টেনে ছাড়লে ধীরে ধীরে আগের জায়গায় ফিরে আসা
করণীয়
খাবার স্যালাইন দিন, নিয়ম মেনে গুলিয়ে। এক প্যাকেট স্যালাইন পুরো পানিতে গুলাতে হয়, অল্প পানিতে গুলিয়ে ঘন করে খাওয়ালে উল্টো ক্ষতি হয়।
শিশুকে খাওয়ানো বন্ধ করবেন না। বুকের দুধ চালিয়ে যান।
পায়খানা বন্ধ করার ওষুধ নিজে থেকে খাওয়াবেন না।
পায়খানায় রক্ত গেলে, বারবার বমি হলে বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে সাথে সাথে ডাক্তার দেখান।
জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহে শিশুর অবস্থা খুব দ্রুত বদলায়। এই বয়সে নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখলে দেরি করবেন না।
দুধ টানতে না পারা বা খাওয়া কমে যাওয়া
শরীর অস্বাভাবিক গরম বা অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগা
খুব বেশি ঝিমানো, ডাকলে নড়াচড়া না করা
শ্বাসে সমস্যা
নাভিতে লালচে ভাব, ফোলা বা পুঁজ
ত্বক বা চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, বিশেষ করে হাতের তালু ও পায়ের পাতা পর্যন্ত হলুদ হলে
খিঁচুনি
নবজাতকের ক্ষেত্রে "সকাল হোক, তারপর দেখি" মনোভাব ঝুঁকিপূর্ণ।
সামান্য সর্দি কাশিতে অ্যান্টিবায়োটিক। ফার্মেসি থেকে নিজে কিনে খাওয়ানোর অভ্যাসটা দীর্ঘমেয়াদে শিশুর জন্যই ক্ষতিকর।
টিকা বাদ দেওয়া বা দেরি করা। নিউমোনিয়াসহ বেশ কিছু গুরুতর রোগ টিকা দিয়ে প্রতিরোধ করা যায়। ইপিআই কার্ডের সময়সূচি মেনে চলুন।
ওজন বাড়ছে কিনা খেয়াল না রাখা। শিশুর ওজন ঠিকমতো না বাড়া অনেক সমস্যার প্রথম সংকেত।
উপসর্গ কমে গেলে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া। ডাক্তার যতদিন বলেছেন ততদিনই চালাতে হবে।
ঘরোয়া টোটকায় সময় নষ্ট করা। বিপদচিহ্ন দেখা দিলে হাসপাতালে যাওয়ার বিকল্প নেই।
শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician) শিশুর যেকোনো অসুস্থতা, নিয়মিত চেকআপ, টিকা ও পুষ্টি সংক্রান্ত পরামর্শের জন্য প্রথম গন্তব্য।
নবজাতক বিশেষজ্ঞ (Neonatologist) জন্মের পর প্রথম মাসের জটিলতা, কম ওজনের বা সময়ের আগে জন্ম নেওয়া শিশুর ক্ষেত্রে।
জরুরি বিভাগ উপরে বলা বিপদচিহ্নগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে, সরাসরি।
শিশুকে বড়দের ডাক্তার দেখানো বা বড়দের ওষুধ খাওয়ানো এড়িয়ে চলুন। শিশুর শরীরের হিসাব সম্পূর্ণ আলাদা।
DoctorsFindBD-তে এলাকা ও বিশেষত্ব ধরে ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন, সাথে চেম্বারের ঠিকানা ও ভিজিটিং আওয়ার এক জায়গায়।
শিশুর অসুস্থতায় সবচেয়ে বড় সুবিধা বাবা মায়েরই থাকে, কারণ তারাই সবার আগে বুঝতে পারেন কিছু একটা ঠিক নেই।
উপরের বিপদচিহ্নগুলো একবার মুখস্থ করে রাখুন, বা লেখাটা সেভ করে রাখুন। দরকারের সময় এই তথ্যটুকুই যথেষ্ট।
আর সবচেয়ে সহজ নিয়মটা হলো, সন্দেহ হলে ডাক্তার দেখান। ভুল প্রমাণিত হওয়া দেরি করার চেয়ে অনেক ভালো।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) Chart Booklet: cdn.who.int
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Child mortality (under 5 years) fact sheet: who.int
UNICEF Bangladesh শিশু নিউমোনিয়া সংক্রান্ত প্রতিবেদন: unicef.org
WHO IMCI Respiratory Illness Clinical Guidelines, শ্বাসের হার সংক্রান্ত মানদণ্ড: ncbi.nlm.nih.gov