জন্ম থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত সরকারি EPI কর্মসূচিতে শিশুকে কোন টিকা কবে দিতে হয়, কোন টিকা কোন রোগ ঠেকায়, তারিখ পিছিয়ে গেলে কী করবেন, আর জন্মতারিখ দিয়ে নিজের শিশুর পুরো সময়সূচি বের করার সহজ উপায়।

শিশুর টিকা নিয়ে বাবা মায়ের সবচেয়ে সাধারণ সমস্যাটা কোনো দ্বিধা নয়। বেশিরভাগ মানুষই জানেন টিকা দিতে হবে। সমস্যা হলো মনে রাখা।
টিকার কার্ডটা কোথাও রেখে ভুলে যাওয়া, পরের তারিখটা মনে না থাকা, বা "এই মাসে দিতে হবে" পর্যন্ত মনে থাকলেও ঠিক কোন দিন সেটা না জানা। এভাবেই একটা দুইটা ডোজ পিছিয়ে যায়, আর কখনো কখনো একেবারে বাদ পড়ে যায়।
অথচ শিশুর জীবনের প্রথম দেড় বছরে দেওয়া এই টিকাগুলোই তাকে ১০টির বেশি গুরুতর রোগ থেকে বাঁচায়। এর অনেকগুলোরই কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, শুধু প্রতিরোধ আছে।
এই লেখায় পুরো সময়সূচিটা এক জায়গায় দেওয়া হলো, সাথে একটা সহজ উপায় যাতে আপনাকে আর হিসাব করতে না হয়।
বাংলাদেশে শিশুদের টিকা দেওয়া হয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা EPI-এর আওতায়। ১৯৭৯ সালে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি দেশের স্বাস্থ্যখাতের সবচেয়ে সফল উদ্যোগগুলোর একটি।
এর ফলাফলও স্পষ্ট। বাংলাদেশ ২০১৪ সালে পোলিওমুক্ত ঘোষিত হয়েছে, আর ২০০৮ সালে মা ও নবজাতকের ধনুষ্টংকার নির্মূল করতে পেরেছে।
দুইটা বিষয় জেনে রাখা দরকার:
টিকা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। সরকারি হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক আর নির্ধারিত EPI কেন্দ্রে কোনো টাকা লাগে না।
একদিনে একাধিক টিকা দেওয়া যায়। শরীরের আলাদা আলাদা জায়গায় দেওয়া হয়, এতে কোনো সমস্যা হয় না। অনেকে ভয় পেয়ে একটা একটা করে দিতে চান, এতে সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যায়।
জন্মের পরপরই
বিসিজি (BCG), এক ডোজ। প্রতিরোধ করে যক্ষ্মা।
জন্মের পর যত দ্রুত সম্ভব দেওয়াই ভালো। বাম বাহুর উপরের অংশে দেওয়া হয়, পরে সেখানে ছোট একটা দাগ থেকে যায়। এই দাগটাই প্রমাণ যে টিকা দেওয়া হয়েছে।
৬ সপ্তাহ বয়সে
পেন্টাভ্যালেন্ট, ১ম ডোজ
ওপিভি (মুখে খাওয়ানো পোলিও), ১ম ডোজ
পিসিভি, ১ম ডোজ
এফআইপিভি (ইনজেকশনের পোলিও), ১ম ডোজ
পেন্টাভ্যালেন্ট একটা টিকাতেই পাঁচটা রোগ ঠেকায়: ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টংকার, হুপিং কাশি, হেপাটাইটিস বি এবং হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ বি।
পিসিভি ঠেকায় নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া, যা শিশুমৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।
১০ সপ্তাহ বয়সে
পেন্টাভ্যালেন্ট, ২য় ডোজ
ওপিভি, ২য় ডোজ
পিসিভি, ২য় ডোজ
১৪ সপ্তাহ বয়সে
পেন্টাভ্যালেন্ট, ৩য় ডোজ
ওপিভি, ৩য় ডোজ
পিসিভি, ৩য় ডোজ
এফআইপিভি, ২য় ডোজ
এই ধাপে এসে শিশুর প্রাথমিক টিকার মূল অংশটা শেষ হয়।
৯ মাস বয়সে
এমআর (MR), ১ম ডোজ। প্রতিরোধ করে হাম ও রুবেলা।
১৫ মাস বয়সে
এমআর, ২য় ডোজ।
এই দ্বিতীয় ডোজটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি অবহেলা হয়। শিশু তখন বড় হয়ে গেছে, বাবা মা ভাবেন কাজ শেষ। বাস্তবে প্রথম ডোজেই পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না, দ্বিতীয় ডোজটাও সমান জরুরি।
কথাটা আলাদা করে বলা দরকার, কারণ ২০২৬ সালে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
হাম শুধু গায়ে র্যাশ ওঠা কোনো সাধারণ রোগ নয়। এটা থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরো বেশি।
আর হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে। একটি আক্রান্ত শিশু থেকে আশপাশের টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়ায়।
তাই ৯ মাস আর ১৫ মাস, দুইটা ডোজই নিশ্চিত করুন।
এটা নিয়ে অনেকে অকারণে দুশ্চিন্তা করেন, আবার অনেকে উল্টো ভেবে বসেন যে সময় পার হয়ে গেছে মানে আর দিয়ে লাভ নেই।
দুইটাই ভুল।
তারিখ পার হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব EPI কেন্দ্রে যান। আগে থেকে শুরু করতে হবে না, যেখানে থেমেছে সেখান থেকেই চালিয়ে যেতে হবে।
মানে দ্বিতীয় ডোজ দেরিতে দিলে আবার প্রথম ডোজ থেকে শুরু করার দরকার নেই। বাকি ডোজগুলো নিয়ম মেনে দিয়ে দিলেই হবে।
তবে দেরি না করাই ভালো, কারণ যতদিন কোর্স অসম্পূর্ণ থাকে ততদিন শিশু ঝুঁকির মধ্যে থাকে।
কার্ড হারিয়ে গেলে বা কোন ডোজ কবে দিয়েছেন মনে না থাকলে EPI কেন্দ্রে গিয়ে জানান, তাদের রেজিস্টারে তথ্য থাকে।
টিকার পর হালকা জ্বর, ইনজেকশনের জায়গায় ব্যথা, ফোলা বা লালচে ভাব, কিংবা শিশুর একটু খিটখিটে হওয়া স্বাভাবিক। এটা শরীর প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করছে তারই লক্ষণ। সাধারণত এক দুই দিনে ঠিক হয়ে যায়।
যা করবেন
শিশুকে বেশি করে বুকের দুধ বা তরল খাওয়ান। ইনজেকশনের জায়গায় হাত দিয়ে ঘষবেন না।
জ্বরের ওষুধ লাগবে কিনা এবং কতটুকু, সেটা টিকা দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যকর্মীকে জিজ্ঞেস করে নিন, বা ডাক্তারের পরামর্শ নিন। বড়দের ওষুধ ভেঙে খাওয়াবেন না।
যেসব ক্ষেত্রে ডাক্তার দেখাবেন
খুব বেশি জ্বর, বা জ্বর দুই দিনের বেশি স্থায়ী হলে
খিঁচুনি
অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা ডাকলে সাড়া না দেওয়া
শ্বাস নিতে কষ্ট
ইনজেকশনের জায়গা বেশি ফুলে যাওয়া বা পুঁজ হওয়া
শিশু কিছু খেতে না পারা
"শিশু অসুস্থ, তাই আজ টিকা দিব না।" হালকা সর্দি, কাশি বা সামান্য জ্বর থাকলে সাধারণত টিকা দেওয়া যায়। তবু সন্দেহ থাকলে কেন্দ্রে গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীকে জানান, তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন। নিজে থেকে বাদ দিবেন না।
"একদিনে এতগুলো টিকা শিশুর জন্য বেশি হয়ে যাবে।" একসাথে একাধিক টিকা দেওয়া নিরাপদ, আলাদা জায়গায় দেওয়া হয়।
"বেসরকারি ক্লিনিকের টিকা ভালো।" EPI-এর টিকাগুলো একই মানের এবং বিনামূল্যে।
"টিকা দিলে শিশু দুর্বল হয়ে যায়।" এর কোনো ভিত্তি নেই।
"আমাদের সময় তো এত টিকা ছিল না, তাও তো বেঁচে আছি।" যে রোগগুলো এখন বিরল হয়ে গেছে, সেগুলো বিরল হয়েছে এই টিকার কারণেই।
কার্ডটা শুধু টিকার হিসাব নয়। স্কুলে ভর্তি, পাসপোর্ট বা ভবিষ্যতে চিকিৎসার সময়ও এটা কাজে লাগতে পারে।
একটা সহজ কাজ করে রাখুন, কার্ডের দুই পাশের ছবি তুলে ফোনে সেভ করে রাখুন। কার্ড হারালেও তথ্যটা থাকবে।
উপরের তালিকাটা সাধারণ। কিন্তু আপনার শিশুর ক্ষেত্রে ৬ সপ্তাহ মানে ঠিক কোন তারিখ, ১৪ সপ্তাহ কবে পড়বে, ৯ মাস কোন দিন, সেটা হিসাব করা ঝামেলার।
এই কাজটা সহজ করার জন্য আমরা একটা ফ্রি টুল বানিয়েছি।
শিশুর জন্মতারিখটা দিলেই EPI অনুযায়ী প্রতিটি টিকার সঠিক তারিখ বের হয়ে আসবে। কোন টিকা পরের বার দিতে হবে, কতগুলো হয়ে গেছে, সব দেখতে পারবেন। চাইলে পুরো সময়সূচিটা ছবি হিসেবে ফোনে সেভ করে রাখতে পারবেন বা পরিবারের সাথে শেয়ার করতে পারবেন।
কোনো টাকা লাগে না, account খুলতে হয় না।
টিকার জন্য নিকটস্থ EPI কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা সরকারি হাসপাতাল। সাধারণত নির্দিষ্ট দিনে টিকা দেওয়া হয়, স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর কাছ থেকে দিন জেনে নিন।
শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician) দেখাবেন যদি:
শিশু সময়ের আগে জন্ম নিয়েছে বা জন্মের সময় ওজন কম ছিল
শিশুর কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাজনিত সমস্যা আছে
আগের কোনো টিকার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল
সময়সূচি অনেকটা পিছিয়ে গেছে এবং কীভাবে ধরাবেন বুঝতে পারছেন না
EPI-র বাইরের টিকা যেমন রোটাভাইরাস, চিকেনপক্স বা ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে জানতে চান
DoctorsFindBD-তে এলাকা ও বিশেষত্ব ধরে ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন, সাথে চেম্বারের ঠিকানা ও ভিজিটিং আওয়ার এক জায়গায়।
শিশুর টিকা এমন একটা কাজ যেখানে দেরির কোনো লাভ নেই, আর সময়মতো করলে সারা জীবনের সুরক্ষা।
জন্মতারিখটা একবার বসিয়ে পুরো সময়সূচিটা বের করে ফোনে সেভ করে রাখুন। এরপর আর মনে রাখার চাপ থাকবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Expanded Programme on Immunization (EPI) Factsheet, Bangladesh: who.int
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) জাতীয় টিকাদান সময়সূচি: dghs.gov.bd
Gavi Zero-Dose Learning Hub Bangladesh Childhood Vaccination Schedule: zdlh.gavi.org
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Integrated Management of Childhood Illness (IMCI) নির্দেশিকা