জ্বর হলেই আতঙ্ক নয়, আবার অপেক্ষা করাও নিরাপদ নয়। ডেঙ্গু সন্দেহ হলে ঠিক কোন সময়ে, কোন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে কী প্রস্তুতি নেবেন খুলনার পরিবারগুলোর জন্য একটি ব্যবহারিক গাইড।

বর্ষার সময় খুলনায় জ্বরের রোগী বেড়ে যায়। বেশিরভাগই সাধারণ ভাইরাল জ্বর, কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে সেটা ডেঙ্গু হয়ে দাঁড়ায়। সমস্যাটা হলো, প্রথম দুই-তিন দিনে এই দুইটার পার্থক্য বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
অনেক পরিবার তাই দুইটা ভুলের যেকোনো একটা করে ফেলেন। হয় প্রথম দিনেই আতঙ্কিত হয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন, নয়তো "সেরে যাবে" ভেবে এমন সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করেন যখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে গেছে।
এই লেখাটা ডেঙ্গু কী, সেটা বোঝানোর জন্য নয়। এটা শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য কখন, কার কাছে যাবেন।
সব জ্বরে সাথে সাথে ডাক্তারের কাছে দৌড়ানোর দরকার হয় না। তবে বর্ষা ও তার পরের মাসগুলোতে, যখন এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকে, তখন হিসাবটা আলাদা।
সাধারণ নিয়ম হিসেবে ধরতে পারেন:
জ্বর ৪৮ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে ডাক্তার দেখানো উচিত
আশেপাশে বা পরিবারে সম্প্রতি কারো ডেঙ্গু হয়ে থাকলে প্রথম দিনেই দেখান
রোগী শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, অথবা ডায়াবেটিস, কিডনি বা হৃদরোগে আক্রান্ত হলে অপেক্ষা করবেন না
শেষের দলটির ক্ষেত্রে ডেঙ্গু দ্রুত জটিল হতে পারে, তাই এখানে "আরেকটু দেখি" মনোভাব ঝুঁকিপূর্ণ।
ডেঙ্গুর গতিপথ সাধারণত তিনটি ধাপে যায়। প্রতিটি ধাপে করণীয় আলাদা।
প্রথম ধাপ (দিন ১ থেকে ৩)
জ্বর হঠাৎ করে ওঠে, সাথে মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথা থাকে। এই সময়ে ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া ভালো, কারণ তিনিই ঠিক করবেন পরীক্ষা লাগবে কিনা এবং কোন ওষুধ নিরাপদ।
দ্বিতীয় ধাপ (দিন ৪ থেকে ৬) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
এই সময়ে জ্বর কমতে শুরু করে। অনেকে ভাবেন বিপদ কেটে গেছে। বাস্তবে ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় শুরুই হয় জ্বর নামার পর। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা CDC-র তথ্য অনুযায়ী, তীব্র ডেঙ্গু প্রায়ই শুরু হয় জ্বর নেমে যাওয়ার এক থেকে দুই দিনের মধ্যে।
তাই জ্বর কমে গেলেও রোগীকে চোখে চোখে রাখুন। এই সময়ে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ রাখাটা সবচেয়ে জরুরি।
তৃতীয় ধাপ (দিন ৭ থেকে ১০)
শরীর ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকে। দুর্বলতা কিছুদিন থাকতে পারে। ডাক্তার বললে ফলো-আপে যাবেন।
নিচের যেকোনো একটি দেখা দিলে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
পেটে তীব্র ব্যথা
বারবার বমি হওয়া
নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া
কালো রঙের পায়খানা
শ্বাস নিতে কষ্ট
হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
অতিরিক্ত নিস্তেজ, ঝিমুনি অথবা অস্বাভাবিক অস্থিরতা
প্রস্রাব অনেক কমে যাওয়া বা ৬-৮ ঘণ্টা প্রস্রাব না হওয়া
এগুলোকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে "warning signs" বলা হয়। এই পর্যায়ে চেম্বারে সিরিয়ালের জন্য অপেক্ষা না করে জরুরি বিভাগই সঠিক জায়গা।
এটা নিয়েই সবচেয়ে বেশি দ্বিধা তৈরি হয়। সহজ করে বললে:
প্রাপ্তবয়স্ক রোগী → মেডিসিন বিশেষজ্ঞ (Medicine Specialist)
জ্বর, ডেঙ্গু সন্দেহ, সাধারণ শারীরিক জটিলতা এসবের প্রথম গন্তব্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। তিনি প্রয়োজনে অন্য বিভাগে পাঠাবেন।
শিশু রোগী → শিশু বিশেষজ্ঞ (Pediatrician)
বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ওষুধের মাত্রা, পানিশূন্যতার হিসাব সবই আলাদা। তাই সরাসরি শিশু বিশেষজ্ঞ দেখানোই নিরাপদ।
গর্ভবতী নারী → গাইনি বিশেষজ্ঞ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ একসাথে
গর্ভাবস্থায় ডেঙ্গু হলে মা ও শিশু দুজনের দিকেই নজর রাখতে হয়। নিজের গাইনি ডাক্তারকে অবশ্যই জানাবেন।
Warning signs থাকলে → সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ
এই অবস্থায় কোন বিশেষজ্ঞ ভালো, সেটা খোঁজার সময় নেই। হাসপাতালে পৌঁছানোটাই অগ্রাধিকার।
চেম্বারে সাধারণত সময় কম পাওয়া যায়। আগে থেকে কয়েকটা জিনিস গুছিয়ে নিলে ডাক্তার অনেক দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন।
জ্বর কবে থেকে শুরু, তারিখটা মনে রাখুন। ডেঙ্গুর চিকিৎসায় "জ্বরের কত নম্বর দিন" এই তথ্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
এখন পর্যন্ত কী কী ওষুধ খাওয়া হয়েছে, তার তালিকা বা প্যাকেটগুলো সাথে নিন
আগের কোনো রিপোর্ট থাকলে সব একসাথে নিন, বিশেষ করে আগের রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট
রোগীর অন্য কোনো রোগ আছে কিনা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, হৃদরোগ এগুলো বলতে ভুলবেন না
পরিবারে বা প্রতিবেশীর কারো সম্প্রতি ডেঙ্গু হয়েছে কিনা, এই তথ্যটাও ডাক্তারের কাজে লাগে
প্রস্রাবের পরিমাণ কমেছে কিনা খেয়াল করে যান
অনেকে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে বুঝতে পারেন, আসল প্রশ্নটাই করা হয়নি। নিচের চারটা প্রশ্ন করে আসলে বাসায় গিয়ে দ্বিধা থাকবে না।
কোন কোন লক্ষণ দেখলে আমি সাথে সাথে হাসপাতালে যাব?
পরের বার কবে দেখা করতে হবে, বা কবে আবার পরীক্ষা করাতে হবে?
রোগীকে দিনে কতটুকু তরল খাওয়াতে হবে?
কোন ওষুধগুলো এড়িয়ে চলতে হবে?
শেষ প্রশ্নটা বিশেষভাবে জরুরি, কারণ ডেঙ্গুতে কিছু সাধারণ ব্যথা ও জ্বরের ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
ডেঙ্গু নিশ্চিত করার জন্য রক্ত পরীক্ষা লাগে। বাংলাদেশে সাধারণত NS1 অ্যান্টিজেন পরীক্ষার মাধ্যমে ডেঙ্গু শনাক্ত করা হয়, আর প্রয়োজনে রক্তের অন্যান্য পরীক্ষা করা হয়।
তবে দুইটা বিষয় মনে রাখবেন:
কোন পরীক্ষা, কখন করাতে হবে সেটা ডাক্তার ঠিক করবেন। জ্বরের কোন দিনে কোন পরীক্ষা কাজ করে, তার নির্দিষ্ট নিয়ম আছে। নিজে থেকে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে পরীক্ষা করালে ভুল সময়ে করা হয়ে যেতে পারে, ফলাফলও বিভ্রান্তিকর হতে পারে।
রিপোর্ট নেগেটিভ এলেই নিশ্চিন্ত হবেন না। উপসর্গ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলুন।
ফার্মেসি থেকে নিজে ওষুধ নেওয়া। জ্বর হলেই ব্যথার ওষুধ কিনে খাওয়ার অভ্যাসটা ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হতে পারে।
জ্বর নামলেই চিকিৎসা বন্ধ করা। আগেই বলা হয়েছে, এই সময়টাই সবচেয়ে সতর্ক থাকার সময়।
পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া। প্লেটলেটের সংখ্যা দেখে আতঙ্কিত হওয়া বা নিশ্চিন্ত হওয়া, দুটোই ঠিক নয়। রিপোর্ট ব্যাখ্যা করার কাজটা ডাক্তারের।
দূরের বড় হাসপাতালে যাওয়ার জন্য দেরি করা। warning signs দেখা দিলে কাছের হাসপাতালে যাওয়াটাই আগে দরকার।
জ্বর নিয়ে দুশ্চিন্তার সময় সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজটা হলো ডাক্তার খোঁজা। কে কোথায় বসেন, কয়টা থেকে কয়টা, চেম্বারটা ঠিক কোথায় এই তথ্যগুলো খুঁজতে গিয়েই মূল্যবান সময় চলে যায়।
DoctorsFindBD-তে আপনি এলাকা ও বিশেষত্ব ধরে ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন, সাথে চেম্বারের ঠিকানা ও ভিজিটিং আওয়ার এক জায়গায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Dengue and severe dengue: who.int
US CDC Clinical Features of Dengue: cdc.gov
US CDC Severe Dengue: Know the Warning Signs: cdc.gov
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় দৈনিক ডেঙ্গু পরিস্থিতি: dashboard.dghs.gov.bd
IEDCR, বাংলাদেশ National Guideline for Clinical Management of Dengue Syndrome: nbph.iedcr.gov.bd