কুকুর বা বিড়াল কামড়ালে প্রথম ১৫ মিনিটে যা করতে হবে
জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ যেখানে উপসর্গ শুরু হলে বাঁচার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। অথচ কামড়ের পরপরই সঠিক পদক্ষেপ নিলে এটি প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। ক্ষত ধোয়ার সঠিক নিয়ম, কখন হাসপাতালে যেতে হবে, আর কোন ভুলগুলো প্রাণঘাতী হতে পারে।

রাস্তার কুকুর তাড়া করেছে, পায়ে একটা আঁচড় লেগেছে। কিংবা বাসার বিড়াল খেলতে গিয়ে হাতে কামড় বসিয়ে দিয়েছে। রক্ত তেমন বের হয়নি, তাই অনেকেই ভাবেন এটা এমন কিছু না।
এই "এমন কিছু না" ভাবনাটাই জলাতঙ্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বিপজ্জনক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মানুষের জলাতঙ্কের ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই কারণ কুকুরের কামড় বা আঁচড়। আর একবার ভাইরাস স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছে গিয়ে উপসর্গ দেখা দিলে এই রোগে মৃত্যুর হার ১০০ শতাংশ। কোনো চিকিৎসা নেই।
কিন্তু এর উল্টো দিকটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কামড়ের পরপরই সঠিক ব্যবস্থা নিলে জলাতঙ্ক প্রায় পুরোপুরি প্রতিরোধ করা যায়।
মানে পুরো বিষয়টা নির্ভর করে আপনি প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কী করলেন তার উপর।
বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র
দেশে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ২০১১ সালে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি চালুর পর মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০১০ সালের আগে যেখানে বছরে দুই হাজারের বেশি মানুষ জলাতঙ্কে মারা যেতেন, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সংখ্যাটা অনেক কমে এসেছে।
তবে উদ্বেগের জায়গাও আছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জন জলাতঙ্কে মারা গেছেন। অর্থাৎ মৃত্যুর সংখ্যা আবার বাড়ছে।
আরো একটা তথ্য চোখ খুলে দেওয়ার মতো। বাংলাদেশে একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুরে কামড়ানো রোগীদের ৫৯ শতাংশ প্রথমে হাসপাতালে না গিয়ে কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের কাছে যান, আর মাত্র ২ শতাংশ সাবান পানি দিয়ে ঠিকমতো ক্ষত ধুয়েছিলেন।
সমস্যাটা ভ্যাকসিন না থাকার নয়। সমস্যাটা জানার।
প্রথম কাজ: ১৫ মিনিট ধরে ক্ষত ধোয়া
এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, আর এটাই সবচেয়ে বেশি অবহেলা করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, কামড় বা আঁচড়ের পর যত দ্রুত সম্ভব সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে কমপক্ষে ১৫ মিনিট ধরে ক্ষত ধুতে হবে।
কীভাবে ধোবেন
কল ছেড়ে দিন বা কেউ ধীরে ধীরে পানি ঢালুক। যেকোনো সাবান চলবে, গোসলের সাবান, হাত ধোয়ার সাবান, এমনকি থালা ধোয়ার সাবানও।
সাবান লাগিয়ে ক্ষতের ভিতর ও চারপাশে হালকা করে ঘষুন, আর পানি ঢালা চালিয়ে যান। মাঝে মাঝে আবার সাবান লাগান।
ঘড়ি ধরে ১৫ মিনিট পূর্ণ করুন। এটা অনেক লম্বা সময় মনে হবে, কিন্তু এই সময়টুকুই ভাইরাসের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
কেন সাবান
জলাতঙ্কের ভাইরাসের বাইরের আবরণ চর্বিজাতীয়। সাবান সেই আবরণ ভেঙে দিতে পারে। এই কারণেই শুধু পানি নয়, সাবান দিয়ে ধোয়ার কথা আলাদা করে বলা হয়।
ধোয়ার পর
থাকলে পভিডোন আয়োডিন বা অ্যান্টিসেপটিক লাগাতে পারেন। না থাকলে দেরি করবেন না, ধোয়াটাই মূল কাজ।
তারপর দ্রুত হাসপাতালে যান।
যা কখনোই করবেন না
আমাদের দেশে ক্ষতের উপর যেসব জিনিস দেওয়ার চল আছে, সেগুলোর প্রায় সবই ক্ষতিকর।
মরিচের গুঁড়া, চুন, হলুদ, কেরোসিন, তেল বা ছাই লাগাবেন না। এগুলো ভাইরাস মারে না, বরং ক্ষত আরো খারাপ করে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
ঝাড়ফুঁক বা কবিরাজের কাছে যাবেন না। এতে যে সময়টা নষ্ট হয়, সেটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি।
ক্ষত শক্ত করে বেঁধে ফেলবেন না বা সেলাই করাতে যাবেন না। কামড়ের ক্ষত সাধারণত সাথে সাথে সেলাই করা হয় না, কারণ এতে ভাইরাস ভিতরে আটকে যেতে পারে। কী করতে হবে সেটা ডাক্তার ঠিক করবেন।
"কুকুরটা মরে কিনা সাত দিন দেখি" ভাববেন না। অপেক্ষা করার এই অভ্যাসটাই বহু মৃত্যুর কারণ। চিকিৎসা শুরু করে দিন, প্রাণীটির অবস্থা পরে দেখা যাবে।
রক্ত বের হয়নি বলে হেলাফেলা করবেন না। চামড়া ছিলে যাওয়া বা হালকা আঁচড়ও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
কোন ধরনের সংস্পর্শে ঝুঁকি কতটা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সংস্পর্শকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে।
ক্যাটাগরি ১: প্রাণীকে ছোঁয়া বা খাওয়ানো, অক্ষত চামড়ায় চেটে দেওয়া। এতে সাধারণত ঝুঁকি নেই।
ক্যাটাগরি ২: খোলা চামড়ায় হালকা কামড় বা রক্ত না বের হওয়া ছোট আঁচড়। এখানে টিকা প্রয়োজন।
ক্যাটাগরি ৩: চামড়া ভেদ করা এক বা একাধিক কামড় বা আঁচড়, ক্ষতস্থানে বা মিউকাস মেমব্রেনে প্রাণীর লালা লাগা, বাদুড়ের সাথে সরাসরি সংস্পর্শ। এখানে টিকার সাথে ইমিউনোগ্লোবুলিনও লাগতে পারে।
আপনার ক্ষেত্রে কোন ক্যাটাগরি প্রযোজ্য এবং কী কী দিতে হবে, সেটা ডাক্তার ক্ষত দেখে ঠিক করবেন। নিজে থেকে ধরে নেবেন না।
বিড়ালের কামড়কে হালকাভাবে নেবেন না
অনেকে ভাবেন বিড়ালে সমস্যা নেই, বিশেষ করে ঘরের পোষা বিড়াল হলে। এটা ভুল ধারণা।
বিড়ালও জলাতঙ্কের ভাইরাস বহন করতে পারে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্যেও কুকুরের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক রোগী আসেন বিড়ালের আক্রমণে।
তাছাড়া বিড়ালের দাঁত সরু ও ধারালো হওয়ায় ক্ষত গভীরে যায় কিন্তু বাইরে থেকে ছোট দেখায়। ফলে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের ঝুঁকিও বেশি থাকে।
পোষা বিড়াল বা কুকুরের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। তবে প্রাণীটির টিকা দেওয়া থাকলে সেই তথ্য ডাক্তারকে জানান, এটা তার সিদ্ধান্তে সাহায্য করে।
টিকা নিয়ে যা জানা দরকার
সময় নষ্ট করবেন না। যত দ্রুত শুরু হয়, তত ভালো। একই দিনে শুরু করাই আদর্শ।
দেরি হয়ে গেলেও যান। কয়েকদিন পার হয়ে গেছে বলে বাদ দেবেন না। উপসর্গ শুরু না হওয়া পর্যন্ত টিকা কাজ করে।
পুরো কোর্স শেষ করতে হবে। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যার জায়গা। ভালো লাগছে বা কুকুরটা সুস্থ আছে দেখে অনেকে মাঝপথে বন্ধ করে দেন। অসম্পূর্ণ টিকা নিরাপত্তা দেয় না। ডাক্তার যে তারিখগুলো দিয়েছেন, প্রতিটাতে যেতে হবে।
কোথায় পাবেন। বাংলাদেশে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির আওতায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হয়। ঢাকায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল এই চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র।
তবে সরবরাহ পরিস্থিতি সবসময় এক থাকে না। যাওয়ার আগে ফোনে খোঁজ নিয়ে গেলে সময় বাঁচবে।
ধনুষ্টংকারের টিকার কথাও ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করুন। কামড়ের ক্ষতে এটাও বিবেচনা করতে হয়।
উপসর্গ দেখা দেওয়ার আগেই ব্যবস্থা নিতে হয়
জলাতঙ্কের ইনকিউবেশন পিরিয়ড সাধারণত দুই থেকে তিন মাস, তবে এটা এক সপ্তাহ থেকে এক বছর পর্যন্ত হতে পারে। কামড়ের জায়গা মস্তিষ্কের যত কাছে হয়, উপসর্গ তত দ্রুত দেখা দেয়।
শুরুর উপসর্গগুলো সাধারণ মনে হয়। জ্বর, ক্ষতস্থানে ব্যথা বা অস্বাভাবিক ঝিনঝিন করা। এরপর ভাইরাস স্নায়ুতন্ত্রে ছড়িয়ে পড়লে পানি দেখে ভয় পাওয়া, বাতাসে ভয় পাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।
এই পর্যায়ে পৌঁছালে আর কিছু করার থাকে না।
তাই পুরো ব্যাপারটাই উপসর্গের আগে, কামড়ের সাথে সাথেই।
শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
বিশ্বব্যাপী জলাতঙ্কে মৃত্যুর ৪০ শতাংশই ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
কারণটা সহজ। শিশুরা প্রাণীর কাছে যায় বেশি, আর কামড় বা আঁচড় লাগলে বকা খাওয়ার ভয়ে অনেক সময় বাসায় বলে না।
তাই বাচ্চাদের বলে রাখুন, কোনো প্রাণী কামড়ালে বা আঁচড় দিলে সাথে সাথে জানাতে হবে, এতে কেউ বকবে না।
আর শিশুর শরীরে অকারণ কোনো আঁচড় বা ক্ষত দেখলে জিজ্ঞেস করুন।
কোন ডাক্তার দেখাবেন
কামড়ের পর প্রথমে যেতে হবে নিকটস্থ সরকারি হাসপাতাল বা জলাতঙ্ক প্রতিরোধ কেন্দ্রে, কারণ টিকা ও ইমিউনোগ্লোবুলিন সেখানেই পাওয়া যায়।
পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজন হতে পারে:
ক্ষতের সংক্রমণ বা জটিলতার জন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
গভীর বা বড় ক্ষত, মুখ বা হাতের ক্ষতের ক্ষেত্রে সার্জারি বিশেষজ্ঞ
শিশুর ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞ
DoctorsFindBD-তে এলাকা ও বিশেষত্ব ধরে ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন, সাথে চেম্বারের ঠিকানা ও ভিজিটিং আওয়ার এক জায়গায়।
মনে রাখার মতো তিনটি কথা
এক, কামড় বা আঁচড় লাগলে সাবান দিয়ে ১৫ মিনিট ধুয়ে ফেলুন।
দুই, ঘরোয়া টোটকায় সময় নষ্ট না করে হাসপাতালে যান।
তিন, টিকার পুরো কোর্স শেষ করুন।
এই তিনটা কাজ ঠিকমতো করলে জলাতঙ্কে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় শূন্যে নেমে আসে। লেখাটা পরিবারের সবাইকে জানিয়ে রাখুন, বিশেষ করে যাদের বাসায় ছোট বাচ্চা আছে।
তথ্যসূত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Rabies fact sheet: who.int
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Rabies vaccines and immunoglobulins, WHO position and exposure categories: who.int
US CDC Rabies Prevention and Control: cdc.gov
জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি, রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) National Guideline for Animal Bite Management in Bangladesh
Global Alliance for Rabies Control National Rabies Elimination Program, Bangladesh: rabiesalliance.org
