হার্ট অ্যাটাক মানেই বুকে হাত দিয়ে লুটিয়ে পড়া নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটা শুরু হয় হালকা অস্বস্তি দিয়ে, যেটাকে মানুষ গ্যাস্ট্রিক ভেবে ফেলে রাখে। লক্ষণগুলো চিনে রাখুন এবং জেনে নিন ঠিক সেই মুহূর্তে কী করতে হবে।

বুকে চাপ চাপ লাগছে, একটু অস্বস্তি। বেশিরভাগ মানুষ প্রথমেই ভাবেন, গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা। একটা অ্যান্টাসিড খেয়ে শুয়ে পড়েন।
এই সিদ্ধান্তটাই কখনো কখনো জীবনের সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়।
হার্ট অ্যাটাক নিয়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটা হলো, এটা হঠাৎ করে নাটকীয়ভাবে হয়। বাস্তবতা ভিন্ন। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, কিছু হার্ট অ্যাটাক হঠাৎ ও তীব্র হলেও বেশিরভাগই শুরু হয় ধীরে ধীরে, হালকা ব্যথা বা অস্বস্তি দিয়ে।
আর হৃদরোগ যে কতটা বড় সমস্যা, সেটাও একবার দেখে নেওয়া দরকার। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, হৃদরোগ ও রক্তনালীর রোগে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ মানুষ মারা যায়, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৩২ শতাংশ। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশই হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের কারণে। উদ্বেগের বিষয় হলো, এই মৃত্যুর তিন চতুর্থাংশের বেশি ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে, যার মধ্যে বাংলাদেশও পড়ে।
তাই লক্ষণগুলো চিনে রাখা শুধু রোগীর জন্য নয়, পরিবারের প্রত্যেকের জন্য জরুরি।
হৃৎপিণ্ড একটা পেশি, আর সব পেশির মতোই তার রক্ত দরকার। এই রক্ত সরবরাহ করে করোনারি ধমনী।
বছরের পর বছর ধরে এই ধমনীর ভিতরের দেয়ালে চর্বি জমতে থাকে। নালী সরু হয়ে আসে। কোনো এক মুহূর্তে সেখানে রক্ত জমাট বেঁধে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
তখন হৃৎপিণ্ডের যে অংশটা রক্ত পাচ্ছে না, সেটা মরতে শুরু করে। এটাই হার্ট অ্যাটাক।
এখানে সময়ের হিসাবটা বোঝা জরুরি। যত মিনিট রক্ত সরবরাহ বন্ধ থাকে, হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি তত বেশি ও তত স্থায়ী হয়। এই কারণেই "একটু দেখি কমে কিনা" মনোভাব এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক।
বুকে অস্বস্তি
সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। বুকের মাঝখানে বা বাম পাশে চাপ, ভারী লাগা, চেপে ধরা বা জ্বালাপোড়ার মতো অনুভূতি।
দুইটা বৈশিষ্ট্য খেয়াল করবেন:
কয়েক মিনিটের বেশি স্থায়ী হয়
অথবা কমে যায়, আবার ফিরে আসে
অনেকে এটাকে ছুরি দিয়ে খোঁচানোর মতো তীব্র ব্যথা ভাবেন। বাস্তবে বেশিরভাগ রোগী বলেন বুকের উপর ভারী কিছু চেপে বসে আছে, এমন লাগে।
শরীরের উপরের অংশে ব্যথা
ব্যথা শুধু বুকেই থাকে না। ছড়িয়ে যেতে পারে:
এক বা দুই হাতে, বিশেষ করে বাম হাতে
কাঁধে
ঘাড়ে
চোয়ালে
পিঠে
পেটের উপরের অংশে
চোয়াল বা পিঠের ব্যথাকে অনেকে দাঁতের সমস্যা বা মাংসপেশির টান ভেবে ভুল করেন।
শ্বাসকষ্ট
বুকে ব্যথা থাকতেও পারে, নাও পারে। সামান্য পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে ওঠা, বা বিশ্রামে থেকেও দম নিতে কষ্ট হওয়া।
অন্যান্য লক্ষণ
হঠাৎ ঠান্ডা ঘাম হওয়া
বমি বমি ভাব বা বমি
মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
বুক ধড়ফড় করা
অকারণে ভীষণ অস্থির লাগা
নারীদের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি। তবে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন বলছে, নারীদের ক্ষেত্রে এমন কিছু উপসর্গ বেশি দেখা যায় যেগুলোকে সাধারণত হার্ট অ্যাটাকের সাথে মেলানো হয় না।
শ্বাসকষ্ট
বমি বমি ভাব বা বমি
পিঠ, কাঁধ বা চোয়ালে ব্যথা
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
এই উপসর্গগুলো অস্পষ্ট বলে অনেক সময় সেগুলোকে গ্যাস্ট্রিক, দুর্বলতা বা বয়সের স্বাভাবিক সমস্যা ধরে নেওয়া হয়। ফলে হাসপাতালে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যায়।
আমাদের সমাজে নারীরা নিজের শারীরিক অস্বস্তি চেপে রাখেন বেশি। পরিবারের সদস্যদের এই জায়গাটায় বাড়তি নজর দিতে হবে।
একটা কঠিন সত্য হলো, কিছু হার্ট অ্যাটাক নীরবে ঘটে যায়। মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা CDC-র হিসাবে, প্রায় প্রতি পাঁচটি হার্ট অ্যাটাকের একটি নীরব, অর্থাৎ হৃৎপিণ্ডের ক্ষতি হয়ে যায় কিন্তু ব্যক্তি টেরই পান না।
ডায়াবেটিসের রোগীদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা যায়, কারণ দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিস স্নায়ুকে দুর্বল করে দেয়, ব্যথার অনুভূতি কমে যায়।
তাই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কিডনি রোগ থাকলে সামান্য বুকের অস্বস্তি বা অকারণ দুর্বলতাকেও হালকাভাবে নেবেন না।
যা করবেন
১. দেরি না করে জরুরি সাহায্য নিন। বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সেবার নম্বর ৯৯৯। অ্যাম্বুলেন্স বা দ্রুততম যানবাহনে নিকটস্থ হাসপাতালে নিন।
২. এমন হাসপাতালে নিন যেখানে জরুরি বিভাগ ও কার্ডিয়াক সুবিধা আছে। সবচেয়ে ভালো হাসপাতাল খুঁজতে গিয়ে দূরে যাবেন না। দ্রুত পৌঁছানোটা আগে।
৩. রোগীকে বসিয়ে বা আধশোয়া করে রাখুন। টাইট জামাকাপড় ঢিলা করে দিন, ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন।
৪. রোগীর পাশে থাকুন। অবস্থার পরিবর্তন খেয়াল রাখুন।
৫. আগে থেকে ডাক্তারের দেওয়া হৃদরোগের ওষুধ থাকলে সেটা কীভাবে নিতে হবে তা আপনার ডাক্তার আগেই বলে দিয়ে থাকেন, সেই নির্দেশ অনুসরণ করুন।
যা করবেন না
নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাবেন না। পথে অবস্থা খারাপ হলে বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অন্য কাউকে দিয়ে নিন।
নিজে থেকে কোনো ওষুধ খাবেন বা খাওয়াবেন না। পরিচিত কারো হৃদরোগের ওষুধ ধার করে খাওয়ানো বিপজ্জনক। কোন ওষুধ নিরাপদ সেটা ডাক্তার বা জরুরি সেবার কর্মী বলবেন।
"একটু কমুক, তারপর দেখি" ভাববেন না। ভুল প্রমাণিত হয়ে হাসপাতাল থেকে ফিরে আসা অনেক ভালো, দেরি করে পৌঁছানোর চেয়ে।
ব্যথা কমে গেলেই নিশ্চিন্ত হবেন না। উপসর্গ চলে গেলেও ডাক্তার দেখিয়ে নিন।
কিছু ঝুঁকি আপনার হাতে নেই, যেমন বয়স বাড়া বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকা।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বেশিরভাগ হৃদরোগই প্রতিরোধযোগ্য, কারণ এর মূল কারণগুলো আচরণগত ও পরিবেশগত। যেমন:
তামাক ও ধূমপান
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, বিশেষ করে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বি
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব
অতিরিক্ত ওজন
মদ্যপান
বায়ুদূষণ
এগুলোর প্রভাব শরীরে দেখা দেয় উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ রক্তে শর্করা ও রক্তে চর্বির মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
হৃদরোগের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, রক্তনালীর সমস্যার প্রায়ই কোনো আগাম উপসর্গ থাকে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ভাষায়, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকই অনেক সময় ভিতরের রোগের প্রথম লক্ষণ হয়ে দেখা দেয়।
এই কারণেই নিয়মিত পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। ৩৫ থেকে ৪০ বছরের পর, বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস থাকলে তারও আগে থেকে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রা দেখে নেওয়া উচিত।
কত দিন পরপর কোন পরীক্ষা লাগবে, সেটা আপনার বয়স ও শারীরিক অবস্থার উপর নির্ভর করে। ডাক্তারই সেটা ঠিক করে দেবেন।
জরুরি অবস্থায় কোন বিশেষজ্ঞ ভালো তা খোঁজার সময় নেই। সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
পরীক্ষা বা নিয়মিত ফলোআপের জন্য:
বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা হৃদরোগের ঝুঁকি নিয়ে পরামর্শ চাইলে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ (Cardiologist)
সাধারণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ (Medicine Specialist), প্রয়োজনে তিনি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠাবেন
হার্ট অ্যাটাকের পর পুনর্বাসন ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ
DoctorsFindBD-তে এলাকা ও বিশেষত্ব ধরে ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন, সাথে চেম্বারের ঠিকানা ও ভিজিটিং আওয়ার এক জায়গায়।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে জ্ঞানটা কাজে লাগে ঠিক একটা মুহূর্তে। সেই মুহূর্তে যদি আপনি বা পরিবারের কেউ লক্ষণগুলো চিনতে পারেন এবং দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন, ফলাফল সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে।
লেখাটা পরিবারের সবাইকে একবার পড়তে দিন। বিশেষ করে বাসার বয়স্ক সদস্যদের।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Cardiovascular diseases (CVDs) fact sheet: who.int
American Heart Association Warning Signs of a Heart Attack: heart.org
US CDC About Heart Attack Symptoms, Risk, and Recovery: cdc.gov
US CDC Heart Disease Facts: cdc.gov
World Heart Federation What is Cardiovascular Disease: world-heart-federation.org