শিশুর টিকা শুধু দেওয়া নয়, নির্দিষ্ট বয়সে দেওয়াটাই আসল কথা। কেন প্রতিটি টিকার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করা আছে, দেরি হলে ঠিক কী ঝুঁকি তৈরি হয়, আর জন্মতারিখ দিয়ে পুরো সময়সূচি বের করে রাখার সহজ উপায়।

"টিকা তো দিয়েছি" এই কথাটা বেশিরভাগ বাবা মা নিশ্চিন্ত হয়ে বলেন। এবং বলার মতো কারণও আছে, কারণ বাংলাদেশে টিকা দেওয়ার হার অনেক ভালো।
কিন্তু একটা প্রশ্ন কম করা হয়। কখন দিয়েছেন?
দুই সপ্তাহ দেরিতে দেওয়া আর ঠিক সময়ে দেওয়া, দুইটাই কাগজে একই দেখায়। শিশুর শরীরের কাছে এই দুইটা এক নয়।
টিকার সময়সূচিটা কেউ ইচ্ছামতো বানায়নি। প্রতিটা টিকার জন্য যে বয়সটা ঠিক করা আছে, তার পিছনে নির্দিষ্ট কারণ আছে। এই লেখাটা সেই কারণগুলো নিয়ে।
শিশু জন্মের সময় মায়ের কাছ থেকে যে সুরক্ষা পায়, সেটা ফুরিয়ে যায়
জন্মের সময় মায়ের শরীর থেকে শিশু কিছু অ্যান্টিবডি পায়। এটা প্রথম কয়েক মাস তাকে কিছুটা রক্ষা করে।
কিন্তু এই সুরক্ষা স্থায়ী নয়, ধীরে ধীরে কমতে থাকে। টিকার সময়সূচি এমনভাবে সাজানো যে মায়ের দেওয়া সুরক্ষা যখন কমে আসছে, ঠিক তখনই শিশুর নিজের প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে শুরু করে।
দেরি করলে মাঝখানে একটা ফাঁকা সময় তৈরি হয়। এই সময়টাতেই শিশু সবচেয়ে অরক্ষিত থাকে।
যে বয়সে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তার আগেই সুরক্ষা দরকার
নিউমোনিয়া, হুপিং কাশি বা হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো রোগগুলো ছোট শিশুদের ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী। বয়স যত কম, ঝুঁকি তত বেশি।
তাই ৬, ১০ আর ১৪ সপ্তাহে টিকা দেওয়া হয়, যাতে সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়টা শুরু হওয়ার আগেই শরীর প্রস্তুত থাকে।
তিন মাস দেরিতে দেওয়া মানে ঠিক সেই বিপজ্জনক মাসগুলোতেই শিশু অরক্ষিত থাকল।
ডোজের মাঝের ফাঁকটাও হিসাব করা
পেন্টাভ্যালেন্ট বা পিসিভির মতো টিকা তিন ডোজে দেওয়া হয়, চার সপ্তাহ পরপর।
কারণ এক ডোজে পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না। প্রতিটি ডোজ আগেরটার উপর ভিত্তি করে প্রতিরোধ ক্ষমতা আরো শক্ত করে। আর এই কাজটার জন্য শরীরের একটা নির্দিষ্ট সময় দরকার হয়, তাই ডোজের মাঝে ন্যূনতম ব্যবধান রাখা হয়।
খুব তাড়াতাড়ি দিলেও কাজ হয় না, অনেক দেরি হলে সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
অরক্ষিত সময় বেড়ে যায়। যতদিন কোর্স অসম্পূর্ণ, ততদিন শিশু ঝুঁকির মধ্যে।
একটা ডোজ বাদ পড়লে পুরো সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থাকে। বিশেষ করে হামের দ্বিতীয় ডোজের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। শিশু তখন ১৫ মাসের, বাবা মা ভাবেন কাজ শেষ। বাস্তবে প্রথম ডোজেই পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি হয় না।
একটা দেরি পরেরগুলোকেও টেনে নিয়ে যায়। ৬ সপ্তাহেরটা যদি ৯ সপ্তাহে দেওয়া হয়, তাহলে পুরো সিরিজটাই পিছিয়ে যায়।
অন্য শিশুদের ঝুঁকিও বাড়ে। কিছু শিশু আছে যাদের বয়স বা শারীরিক অবস্থার কারণে টিকা দেওয়া যায় না। তারা সুরক্ষিত থাকে আশপাশের শিশুদের টিকা নেওয়ার কারণে। যত বেশি শিশু সময়মতো টিকা নেয়, রোগ ছড়ানোর সুযোগ তত কমে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে এবং শিশুমৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। এটা শুধু গায়ে র্যাশ ওঠা নয়, এর থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কের প্রদাহ হতে পারে।
এই ধরনের প্রাদুর্ভাব সাধারণত তখনই হয় যখন একটা এলাকায় টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা নেওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে থাকে। কয়েক বছরে একটু একটু করে জমা হওয়া দেরি আর বাদ পড়া ডোজগুলোই এক সময় সংখ্যায় পরিণত হয়।
তাই সময়মতো টিকা দেওয়াটা শুধু নিজের শিশুর জন্য নয়।
এখানে একটা কথা পরিষ্কার করে বলা দরকার, কারণ ভুল ধারণাটা অনেক ক্ষতি করে।
দেরি হয়ে গেছে মানে সুযোগ শেষ, এটা ভুল।
তারিখ পার হয়ে গেলে যত দ্রুত সম্ভব EPI কেন্দ্রে যান। আবার প্রথম থেকে শুরু করতে হবে না। যেখানে থেমেছেন, সেখান থেকেই বাকি ডোজগুলো নিয়ম মেনে দিয়ে দেওয়া হবে।
কার্ড হারিয়ে গেলে বা কোনটা কবে দিয়েছেন মনে না থাকলে কেন্দ্রে গিয়ে জানান, তাদের রেজিস্টারে তথ্য থাকে।
মোট কথা, দেরি হওয়াটা সমস্যা, কিন্তু দেরি হয়ে গেছে বলে বাদ দিয়ে দেওয়াটা তার চেয়ে অনেক বড় সমস্যা।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অবহেলা থেকে নয়। কারণগুলো খুব সাধারণ।
তারিখ মনে না থাকা। কার্ড কোথাও রেখে ভুলে যাওয়া। "এই মাসে দিতে হবে" পর্যন্ত মনে থাকলেও ঠিক কোন দিন সেটা না জানা। শিশুর সামান্য সর্দি কাশি দেখে সেই সপ্তাহটা বাদ দিয়ে দেওয়া, তারপর আর মনে না থাকা।
মানে সমস্যাটা মূলত হিসাব রাখার।
আর এই সমস্যাটার সমাধান সহজ।
শিশুর জন্মতারিখ থেকে ৬ সপ্তাহ, ১০ সপ্তাহ, ১৪ সপ্তাহ, ৯ মাস আর ১৫ মাস ঠিক কোন কোন তারিখে পড়বে, সেটা মনে মনে হিসাব করা ঝামেলার।
এই কাজটার জন্য আমাদের সাইটে একটা ফ্রি টুল আছে।
শিশুর জন্মতারিখটা বসিয়ে দিলেই EPI অনুযায়ী প্রতিটি টিকার সঠিক তারিখ বের হয়ে আসবে।
যা দেখতে পাবেন
পরবর্তী টিকা কবে, আর সেদিন কোন কোন টিকা দিতে হবে
শিশুর বর্তমান বয়স
মোট কয়টি ধাপের মধ্যে কয়টি হয়ে গেছে
জন্ম থেকে ১৫ মাস পর্যন্ত পুরো তালিকা, প্রতিটি টিকা কোন রোগ ঠেকায় সেটাসহ
কোন ধাপগুলোর সময় পেরিয়ে গেছে আর কোনটা সামনে আছে
চাইলে পুরো সময়সূচিটা ছবি হিসেবে সেভ করে রাখতে পারবেন। ফোনে রেখে দিন, বা পরিবারের যিনি টিকা দিতে নিয়ে যান তাকে পাঠিয়ে দিন।
কোনো টাকা লাগে না, account খুলতে হয় না।
টুল থেকে তারিখগুলো পেয়ে গেলে ফোনের ক্যালেন্ডারে বসিয়ে রাখুন, দুই তিন দিন আগে একটা রিমাইন্ডার দিয়ে।
আর টিকার কার্ডের দুই পাশের ছবি তুলে ফোনে সেভ করে রাখুন। কার্ড হারালেও তথ্যটা থাকবে, আর ডাক্তার দেখানোর সময়ও কাজে লাগবে।
সাধারণ টিকার জন্য নিকটস্থ EPI কেন্দ্রই যথেষ্ট। তবে নিচের ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে নেওয়া ভালো।
শিশু সময়ের আগে জন্মেছে বা জন্মের সময় ওজন কম ছিল
শিশুর দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাজনিত সমস্যা আছে
আগের কোনো টিকার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছিল
সময়সূচি অনেকটা পিছিয়ে গেছে এবং কীভাবে ধরাবেন বুঝতে পারছেন না
EPI-র বাইরের টিকা নিয়ে জানতে চান
DoctorsFindBD-তে এলাকা ও বিশেষত্ব ধরে ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন, সাথে চেম্বারের ঠিকানা ও ভিজিটিং আওয়ার এক জায়গায়।
শিশুর টিকা এমন একটা বিষয় যেখানে "দিয়েছি" আর "সময়মতো দিয়েছি" এই দুইটার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।
জন্মতারিখটা একবার বসিয়ে পুরো সময়সূচিটা বের করে রাখুন। এরপর আর মনে রাখার চাপ থাকবে না, আর কোনো ডোজও পিছিয়ে যাবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Expanded Programme on Immunization (EPI) Factsheet, Bangladesh: who.int
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) জাতীয় টিকাদান সময়সূচি: dghs.gov.bd
Gavi Zero-Dose Learning Hub Bangladesh Childhood Vaccination Schedule: zdlh.gavi.org
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Child mortality (under 5 years) fact sheet: who.int