জ্বরের সাথে গাঁটে তীব্র ব্যথা: এটা ডেঙ্গু না চিকুনগুনিয়া
বর্ষার শেষে বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ বাড়ে। উপসর্গ ডেঙ্গুর মতো হলেও দুইটার করণীয় এক নয়, আর নিজে ধরে নিয়ে ওষুধ খেলে বিপদ হতে পারে। পার্থক্য কোথায়, কী করবেন, আর ব্যথা মাসের পর মাস থেকে গেলে কী করণীয়।

জ্বর উঠেছে, সাথে গাঁটে গাঁটে এমন ব্যথা যে বিছানা থেকে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। হাতের আঙুল ফুলে গেছে, সকালে ঘুম থেকে উঠে মুঠো করা যাচ্ছে না।
এই অবস্থায় বেশিরভাগ মানুষ প্রথমে ভাবেন ডেঙ্গু। কেউ ভাবেন বাতের ব্যথা বেড়েছে।
দুইটাই হতে পারে, আবার এটা চিকুনগুনিয়াও হতে পারে।
বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়ার সংক্রমণ সাধারণত বর্ষার পরের মাসগুলোতে সবচেয়ে বেশি হয়, আর ডেঙ্গুর মৌসুমের সাথে অনেকটাই মিলে যায়। উপসর্গও মিলে যায়। ফলে দুইটাকে গুলিয়ে ফেলা খুব সহজ।
কিন্তু গুলিয়ে ফেলাটা ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ দুইটার ক্ষেত্রে করণীয় এক নয়।
চিকুনগুনিয়া আসলে কী
এটা একটা ভাইরাসজনিত রোগ, যা ছড়ায় এডিস মশার কামড়ে। মশাটা একই, যেটা ডেঙ্গু ছড়ায়। এই কারণেই দুইটা রোগ প্রায়ই একই সময়ে, একই এলাকায় দেখা যায়।
নামটা এসেছে একটা আফ্রিকান শব্দ থেকে, যার অর্থ মোটামুটি "বেঁকে যাওয়া"। রোগীরা ব্যথায় শরীর বাঁকিয়ে রাখেন বলেই এই নাম।
বাংলাদেশে এটা নতুন কিছু নয়। ২০০৮ সাল থেকে দেশে এর সংক্রমণ শনাক্ত হয়ে আসছে, আর ২০১৭ সালে ঢাকায় বড় একটা প্রাদুর্ভাব হয়েছিল।
একটা সমস্যা হলো, চিকুনগুনিয়া দেশের নিয়মিত রোগ নজরদারির তালিকায় নেই এবং পরীক্ষার সুবিধাও সব জায়গায় নেই। ফলে প্রকৃত রোগীর সংখ্যা যা রিপোর্ট হয় তার চেয়ে অনেক বেশি বলে ধারণা করা হয়।
উপসর্গ
সাধারণত মশা কামড়ানোর ৪ থেকে ৮ দিনের মধ্যে উপসর্গ শুরু হয়।
প্রধান দুইটি উপসর্গ
হঠাৎ করে বেশি তাপমাত্রার জ্বর
গাঁটে তীব্র ব্যথা
গবেষণায় দেখা গেছে, শনাক্ত হওয়া রোগীদের ৯৫ শতাংশেরও বেশির ক্ষেত্রে এই দুইটি উপসর্গ থাকে।
সাথে থাকতে পারে
মাংসপেশিতে ব্যথা
মাথাব্যথা
গাঁট ফুলে যাওয়া
শরীরে র্যাশ
বমি বমি ভাব
অস্বাভাবিক ক্লান্তি
ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার পার্থক্য কোথায়
পুরোপুরি নিশ্চিত হতে রক্ত পরীক্ষাই লাগে। তবে কিছু পার্থক্য সাধারণভাবে দেখা যায়।
ব্যথার ধরন। চিকুনগুনিয়ায় ব্যথাটা মূলত গাঁটে, বিশেষ করে হাতের আঙুল, কব্জি, গোড়ালি ও হাঁটুতে। প্রায়ই দুই পাশে একসাথে হয়, আর গাঁট ফুলেও যেতে পারে। ডেঙ্গুতে ব্যথা বেশি হয় শরীরে, হাড়ে আর মাংসপেশিতে।
চোখের পেছনে ব্যথা ডেঙ্গুর একটি বেশি পরিচিত লক্ষণ।
রক্তক্ষরণের ঝুঁকি ডেঙ্গুতে বেশি। চিকুনগুনিয়ায় এটা তুলনামূলক কম।
মৃত্যুর ঝুঁকি চিকুনগুনিয়ায় কম। তবে বয়স্ক, নবজাতক এবং ডায়াবেটিস বা হৃদরোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে জটিলতা বেশি হতে পারে।
ব্যথার স্থায়িত্ব চিকুনগুনিয়ায় অনেক বেশি। এটা নিয়েই পরে আলাদা করে বলছি।
তবু নিজে ধরে নিবেন না। একজন মানুষের একসাথে দুইটা রোগও হতে পারে। আর কোন পরীক্ষা কখন করাতে হবে, সেটা ডাক্তারই ঠিক করবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
এই অংশটা মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, কারণ এখানেই সবচেয়ে বড় ভুলটা হয়।
গাঁটের ব্যথা অসহ্য হলে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই ফার্মেসি থেকে ব্যথার ওষুধ কিনে খান।
কিন্তু ডেঙ্গু বাদ দেওয়া না পর্যন্ত এটা বিপজ্জনক। ডেঙ্গুতে কিছু সাধারণ ব্যথার ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
যেহেতু শুরুতে বোঝার উপায় নেই এটা ডেঙ্গু না চিকুনগুনিয়া, তাই নিয়মটা সহজ রাখুন:
জ্বর হলে নিজে থেকে কোনো ব্যথার ওষুধ খাবেন না। কোনটা নিরাপদ সেটা ডাক্তার পরীক্ষা দেখে ঠিক করবেন।
চিকুনগুনিয়া নিশ্চিত হওয়ার পর ডাক্তার হয়তো ব্যথার ওষুধ দিবেন, কিন্তু সেটা তার সিদ্ধান্ত, আপনার নয়।
চিকিৎসা কী
চিকুনগুনিয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। ভাইরাসটা মারার মতো কিছু নেই, শরীর নিজেই সামলায়।
তাই চিকিৎসাটা মূলত উপসর্গ সামলানোর।
বিশ্রাম
প্রচুর পানি, ডাবের পানি বা স্যালাইন
ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বর ও ব্যথার ওষুধ
গাঁট ফুলে থাকলে কী করতে হবে সেটাও ডাক্তারের কাছ থেকে জেনে নিন
জ্বর সাধারণত কয়েক দিনে নেমে যায়। সমস্যাটা শুরু হয় এরপর।
ব্যথা যদি মাসের পর মাস থেকে যায়
চিকুনগুনিয়ার সবচেয়ে কষ্টকর দিকটা এটাই, আর এটা নিয়ে মানুষ সবচেয়ে কম জানে।
জ্বর সেরে যাওয়ার পরও গাঁটের ব্যথা থেকে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের ২৫ থেকে ৪০ শতাংশের ক্ষেত্রে ব্যথা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে থেকে যায়।
এর ফলে অনেকে কাজে ফিরতে পারেন না, সংসারের কাজ করতে কষ্ট হয়, আর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ক্ষতিও হয়।
এই পরিস্থিতিতে যা করবেন
ব্যথা দীর্ঘদিন থাকলে সেটা স্বাভাবিক ধরে নিয়ে সহ্য করে যাবেন না, আবার নিজে থেকে দীর্ঘদিন ব্যথার ওষুধও খেয়ে যাবেন না। দুইটাই ক্ষতিকর।
ডাক্তার দেখান। দীর্ঘমেয়াদি গাঁটের ব্যথার ক্ষেত্রে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা প্রয়োজনে বাতরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ লাগতে পারে। ফিজিওথেরাপি বা নির্দিষ্ট কিছু ব্যায়ামও কাজে আসতে পারে, তবে সেটাও ডাক্তারের পরামর্শে।
কাদের ক্ষেত্রে বাড়তি ঝুঁকি
চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যু বিরল। তবে কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা বেশি হতে পারে।
নবজাতক, বিশেষ করে জন্মের সময় সংক্রমিত হলে
বয়স্ক ব্যক্তি, বিশেষ করে ৬৫ বছরের বেশি
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
গর্ভবতী নারী, বিশেষ করে প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে
এই দলগুলোর ক্ষেত্রে জ্বর হলে দেরি না করে ডাক্তার দেখানোই ভালো।
প্রতিরোধই একমাত্র উপায়
যেহেতু নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই, তাই মশার কামড় থেকে বাঁচাটাই মূল কাজ। আর যেহেতু এডিস মশাই ডেঙ্গু ছড়ায়, একই ব্যবস্থায় দুইটাই ঠেকানো যায়।
ঘরে ও আশপাশে
সপ্তাহে অন্তত একদিন ছাদ, বারান্দা ও উঠান ঘুরে দেখুন কোথাও পানি জমে আছে কিনা
ফুলের টবের নিচের ট্রের পানি ফেলে দিন
ফ্রিজের পেছনের ট্রে আর এসির পানি জমার জায়গা পরিষ্কার রাখুন
পানির ট্যাংক ও বালতি ঢেকে রাখুন
ফেলে রাখা টায়ার, ভাঙা পাত্র ও ডাবের খোসা সরিয়ে ফেলুন
নিজের সুরক্ষায়
দিনের বেলায়ও মশারি ব্যবহার করুন, কারণ এডিস মশা দিনেই বেশি কামড়ায়
হাত পা ঢাকা পোশাক পরুন
জানালা ও দরজায় নেট থাকলে ভালো
আরেকটা কথা। বাড়িতে কেউ আক্রান্ত হলে তাকে মশারির নিচে রাখুন। এতে মশা তাকে কামড়ে অন্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়াতে পারবে না। এই সহজ কাজটা পরিবারের বাকিদের রক্ষা করে।
কখন ডাক্তার দেখাবেন
জ্বর দুই দিনের বেশি থাকলে, বা জ্বরের সাথে গাঁটে তীব্র ব্যথা থাকলে দেরি করবেন না।
সাথে সাথে হাসপাতালে যাবেন যদি পেটে তীব্র ব্যথা, বারবার বমি, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত, শ্বাসকষ্ট, হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বা প্রস্রাব অনেক কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এগুলো ডেঙ্গুর জটিলতার লক্ষণ, আর সেখানে সময়ই সব।
কোন বিশেষজ্ঞ
প্রাপ্তবয়স্কদের জ্বর ও গাঁটের ব্যথায় প্রথম গন্তব্য মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
শিশুদের ক্ষেত্রে শিশু বিশেষজ্ঞ
ব্যথা কয়েক মাস ধরে চললে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ বা বাতরোগ বিশেষজ্ঞ
জটিলতার লক্ষণ থাকলে সরাসরি হাসপাতালের জরুরি বিভাগ
DoctorsFindBD-তে এলাকা ও বিশেষত্ব ধরে ডাক্তার খুঁজে নিতে পারেন, সাথে চেম্বারের ঠিকানা ও ভিজিটিং আওয়ার এক জায়গায়।
শেষ কথা
জ্বরের সাথে গাঁটে তীব্র ব্যথা হলে সেটা কী, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই। আর ঠিক এই কারণেই নিজে ধরে নিয়ে ওষুধ খাওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ।
নিয়মটা সহজ। জ্বর হলে ডাক্তার দেখান, পরীক্ষা করান, আর ব্যথার ওষুধের সিদ্ধান্তটা ডাক্তারের উপর ছাড়ুন।
আর যেহেতু দুইটা রোগই একই মশা ছড়ায়, ঘরের আশপাশে জমে থাকা পানিটুকু ফেলে দেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।
তথ্যসূত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) Chikungunya fact sheet: who.int
US CDC Chikungunya, symptoms and prevention: cdc.gov
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR) চিকুনগুনিয়া পরিস্থিতি ও সুপারিশ: iedcr.gov.bd
Spatiotemporal dynamics and reemergence of chikungunya virus in Bangladesh from 2008 to 2025, দীর্ঘমেয়াদি গাঁটের ব্যথা সংক্রান্ত তথ্য: pubmed.ncbi.nlm.nih.gov
Tropical Medicine and Health Chikungunya outbreak in Bangladesh (2017), clinical characteristics
